আবু সাঈদ:
দাস শব্দটি শুনলেই মানুষের মনে যে চিত্রটি ভেসে ওঠে, তা শব্দশিল্পে অনেকটা এমন, জগত সংসারে তারা শুধু কলুর বলদের মতোই খাটে। পড়াশুনা জানে না। অবলা প্রাণীর মতো মনিবের কথায় যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়। ক্ষমতার লিপ্সায় হরদম হানাহানি করতে থাকে। কিন্তু মানুষের এই ধারণার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ছিলো ইতিহাসের মামলুক পরিচয়ের মানুষগুলো। তারা অসিতে যেমন দক্ষতা দেখিয়েছিলো, মসিতেও তেমন পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছিলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলো। তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলো গৌরবময় এক সমৃদ্ধ সালতানাত। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতিতে ছিলো তাদের অনুপম বৈশিষ্ট্য। রাজনীতি-সমরনীতিতে ছিলো আলাদা স্বাতন্ত্র্য। এমন যুগপৎ একটি সালতানাত প্রতিষ্ঠা করা কি শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে থাকা কোন জাতির পক্ষে সম্ভব? অবশ্যই না। এজন্য মামলুকদের ব্যাপারে এমন ধারণা রাখা তাদের প্রতি অবিচারেরই শামিল।
ক্ষমতার নানা অনুষদে যেসব মামলুক সম্পৃক্ত হতো, তাদেরকে ছোটবেলা থেকেই নিবিড় তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা হতো। ইসলামী ইতিহাসে মামলুকদেরকে সালতানাতের নানা পর্যায়ে সম্পৃক্ত করার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে দেখা যায় খলীফা মামুনুর রশীদকে। তার শাসনামলে তুর্ক, জার্জিস, রুম, কুরজ ও অন্যান্য শহরের দাস ব্যবসায়ীদের থেকে ছোট ছোট মামলুক সংগ্রহ করা হতো। তাদেরকে নিপুণ তত্ত্বাবধানের মধ্য দিয়ে দক্ষ জনবলে পরিণত করা হতো। এ ধারা বহাল রেখেছিলেন তার আপন ভ্রাতা ও পরবর্তী খলীফা মুতাসিম বিল্লাহও। তিনিও নানা স্থান থেকে দাস সংগ্রহ করতেন। নিবিড় তত্ত্বাবধানে তাদেরকে নানা বিষয়ে দক্ষ করে তুলতেন। তাদের আবাসনের জন্য গড়ে দিয়েছিলেন আলাদা এক নগরী। খলীফা মুতাসিমের তিরোধানের পর মামলুকরা নিজেদের কৃতিত্ব গুণে নানা সময় ক্ষমতার মূলে সম্পৃক্ত হতে শুরু করে। যুগ যুগ ধরে এ ধারা চলতে থাকে। সর্বশেষ সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়্যুবের যুগে তারা বিপুল পরিমাণে সালতানাতের অন্দরে প্রবেশ করে।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে ওয়াসিল আল হামাবী মুফাররিজুল কুরুব ফি আখবারি বানী আইয়্যুব গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, খলীফা নাজমুদ্দিন আইয়্যুব প্রচুর পরিমাণে তুর্কি মামলুক ক্রয় করতেন। তাদেরকে বিশেষ তত্ত্বাবধানে নানা বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তুলতেন। সামরিক বিষয়াবলীতে পরিপক্কতার পর বিভিন্ন সমরে তাদের প্রেরণ করতেন। সেখানে তারা বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সমর্থ হতো। নানা সমরের অসম্ভব কৃতিত্ব দেখে সুলতান নাজমুদ্দিন তাদেরকে বিভিন্ন অভিযানের আমীর বানাতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তারা খলীফার এতোটা আস্থা অর্জনে সমর্থ হয় যে, সুলতান তাদের সুদক্ষ একটি দলকে নিজের খেলাফত ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। এভাবে মামলুক সম্প্রদায় খেলাফতের গভীরে নিজেদের শেকড় গেঁথে নেয়।
সুলতান নাজমুদ্দিনের ইন্তেকালের পর খেলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার মতো তার পরিবারে কেবল একমাত্র সন্তান তুরান শাহ থাকে। তবে নৈতিক অবক্ষয় ও রাষ্ট্র পরিচালনার অযোগ্যতা তার কাছে খেলাফতের মতো গুরুভার দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলো। তথাপি ক্ষমতা দাবি করায় মামলুকরা তাকে হত্যা করে। তার পরিবর্তে নাজমুদ্দিনের বিধবা স্ত্রী শাজারাতুদ দুরকে ক্ষমতায় বসানো হয়। শাজারাতুদ দুর ছিলেন মামলুক সম্প্রদায়ের কন্যা। খলীফা নাজমুদ্দিন তাকে আযাদ করে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। তুরান শাহ ছিলো খলীফার প্রথম ঘরের সন্তান।
শাজারাতুদ দুর ক্ষমতায় আরোহণের মধ্য দিয়েই মূলত মামলুক সালতানাতের গোড়াপত্তন হয়। ঐতিহাসিক মাকরীজি আল মাওয়ায়েজ ওয়াল ইতেবার গ্রন্থে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেন, আর শাজারাতুদ দুর হলেন ইসলামের দ্বিতীয় নারী শাসক, যিনি এককভাবে কোন ইসলামী সালতানাত পরিচালনা করেছেন। নারী হিসেবে সর্বপ্রথম ইসলামী সালতানাত পরিচালনা করেন আরওয়া বিনতে আহমাদ। তিনি দীর্ঘ ৫০ বছর পর্যন্ত এককভাবে ইয়ামেনের শাসনভার সামাল দেন। তবে আরওয়া বিনতে আহমাদ আদর্শিকভাবে শিয়া ছিলেন। এবং ফাতেমী সালতানাতের অনুগত থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন।
আরওয়ার সাথে শাজারাতুদ দুরের পার্থক্যের জায়গা হলো, আরওয়া দীর্ঘকাল পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেন। কিন্তু শাজারাতুদ দুর ক্ষমতায় আরোহণের কিছুদিনের মধ্যেই জনগণের ব্যাপক সমালোচনার কারণে তার নতুন স্বামী ইযযুদ্দিন আইবেকের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন। এভাবে আইয়্যুবী সালতানাত শেষে ইসলামী ইতিহাসের নতুন অধ্যায় মামলুক সালতানাতের অভ্যুদয় ঘটে।
মামলুকরা তাদের প্রশাসনে এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত করতো, যারা তাদের নিক্তিতে পূর্ণমাত্রায় উন্নীত হতো। এমন লোকগুলোকে তারা ইতিহাস খ্যাত কায়রো পাহাড়ের দুর্গে ছোট থেকেই নিবিড় তত্ত্বাবধানে গড়ে তুলতো। পরবর্তীতে খেলাফতের নানা পরিষদে তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হতো। ঐতিহাসিক মাকরীজি তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল মাওয়ায়েজ ওয়াল ইতেবারে শিশুদের পরিচর্যার দিকটি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, “বণিকদের থেকে যখন কোন মামলুক সংগ্রহ করা হতো, প্রথমেই তাকে সুলতানের কাছে নিয়ে যাওয়া হতো। অতপর স্বজাতীয় মামলুকদের সাথে তার থাকার ব্যবস্থা করা হতো। শিক্ষা-দীক্ষার জন্য নিয়োগ দেওয়া হতো অভিজ্ঞ কোন গুরুজন। তিনি প্রথমে তাকে কুরআন শরীফ শিক্ষা দিতেন। অতপর ধীরে ধীরে নামাজ-কালাম, জিকির-আজকার থেকে শুরু করে যাবতীয় ধর্মীয় আচার-বিধি শিক্ষা দিতেন। একজন শিশু যখন কৈশরে পা রাখতো, তাকে ধীরে ধীরে সমরবিদ্যা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য সবক দেওয়া হতো। তাদের নীতি-নৈতিকতা বিনির্মাণে তখন সবিশেষ নজর রাখা হতো। আলাদা লোক নিয়োগ দেওয়া হতো প্রত্যেকের জন্য। তারা তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রাখতো। কখনো যদি তার থেকে কোন অনাকাঙ্খিত দোষ প্রকাশ পেয়ে যেতো, তবে কঠোর শাস্তির সম্মুখীন করা হতো। ফলে তাদের আচার-ব্যবহার খুব পরীশিলীত হতো। চিন্তা-চেতনা অনেক পরিশোধিত হতো। তাদের হৃদয়ের গভীরে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ সাধনের এমন এক অনির্বাণ তৃষ্ণা তৈরি হতো, যার জন্য নিজের ব্যক্তিজীবনের সর্বস্ব বিসর্জন দেওয়াও তাদেও কাছে অতিতুচ্ছ হয়ে যেতো।”
কায়রো দুর্গের এসব সদস্যরা পরবর্তীতে সালতানাতের নানা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। উম্মাহর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে জানবাজি রেখে লড়াই করেছিলো। থামিয়ে দিয়েছিলো ক্রুসেডারদের দুর্দান্ত গতি। সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়্যুবির তিরোধানের পর বাইতুল মাকদিস হাতছাড়া হয়ে গেলে দ্বিতীয়বার তারাই পুনরুদ্ধার করেছিলো। এবং ক্রুসেডারদের এমনভাবে পরাজিত করেছিলো যে, সম্রাট লুইচ নবমের নেতৃত্বাধীন পুরো বাহিনীর সম্রাটসহ অর্ধেককে মৃত্যুর ঘাট পার করে দিয়েছিলো। প্রাচ্যের থেকে তাদের লোলুপ দৃষ্টি পূর্ণরুপে সরাতে সক্ষম হয়েছিলো।
কায়রো পাহাড় থেকে শিক্ষা নেওয়া এই মামলুকরাই প্রবল প্রতাপশালী তাতারদের বিজয়ের ধারা বন্ধ করে দিয়েছিলো। তাদেরকে এমন শোচনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি করেছিলো যে, তারা আর কোন দিন ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। অথচ এই তাতারদের ব্যাপারেই কথিত ছিলো, পাহাড় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে গেছে, এই কথা বিশ্বাস করো। কিন্তু তাতার পরাজিত হয়েছে, এই কথায় কখনো বিশ্বাস করো না।
মামলুক সুলতানরা উলামায়ে কেরামকে অনেক সমীহ করতেন। তাদেরকে কাছে ডাকতেন। তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। তাদের সংশোধনীকে আন্তরিকভাবে মান্য করতেন। এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. হুসনুল মুহাযারা নামক গ্রন্থে বলেন, বিখ্যাত মামলুক শাসক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স ইমাম ইযযুদ্দিন বিন আব্দুস সালাম রহ.কে অনেক সমীহ করতেন। সবসময় তার থেকে পরামর্শ নিয়ে চলতেন। ইমাম ইযযুুদ্দিন বিন আব্দুস সালাম রহ. যেদিন পরলোক গমন করেন, তখন সুলতান বাইবার্স আক্ষেপ করে বলেছিলেন, এবার তো আমার সালতানাত টেকানো আর সম্ভবপর হবে না।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইম্বাউল গুমর বি-আবনাইল উমর গ্রন্থে বলেন, মামলুকি সুলতান জাহের বারকুক জামে মাসজিদ নির্মাণের পর সেখানে অনেক উলামায়ে কেরামকে পাঠদানের জন্য নিয়োগ দেন। তাদের অন্যতম ছিলেন ইমাম আলাউদ্দিন আস সিরামী রহ.। তিনি সেখানে ফিকহে হানাফির পাঠদান করতেন। বাদশা তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও গভীর মুহাব্বত করতেন। শায়খের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ এই পরিমাণে ছিলো যে, অনেক সময় তিনি নিজেই শায়খের জায়নামায বিছিয়ে দিতেন।
মামলুকরা বিভিন্ন যুদ্ধের সময় আল্লাহ তাআলার রহমতের আশায় ফুকাহায়ে কেরাম ও বুজুর্গানে দ্বীনকে সঙ্গে রাখতেন। অনেক ক্ষেত্রে সমুখ সমরে ফকীহদেরকেই এগিয়ে দিতেন। যেন আল্লাহর রহমত ত্বরান্বিত হয়। তাতারদের সাথে যুদ্ধের সময় এমনটিই ঘটেছিলো। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক তাকি উদ্দিন মাকরীজি আস-সুলুক নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স যখন চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য তাতারদের মুখোমুখি হন, তখন তিনি ফুকাহায়ে কেরামের দলকেই সামনে রেখেছিলেন।
মামলুকদের সাথে উলামায়ে কেরামের খুবই আন্তরিক সম্পর্ক ছিলো। সেজন্য তারা উলামায়ে কেরামকে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিতেন। তাদের গবেষণার জন্য বিশাল মাকতাবার ব্যবস্থা করে দিতেন। তালেবানে ইলমের জন্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতেন। তাদের পড়াশুনার যাবতীয় ব্যয়ভার সালতানাতের পক্ষ থেকে বহন করতেন। প্রত্যেক মাজহাবের জন্য আলাদা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হতো। মাদ্রাসাগুলোতে অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলীর মাধ্যমে ছাত্রদের যথাযথ পরিচর্যা করা হতো। ফলে একই যুগে বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের বড় বড় অনেক জামাত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো। নমুনা হিসেবে বলা যায়, শামে তখন ছিলো বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম নববী, কাযীল কুযাত ইবনুয যিমলাকানী, শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া, ইমাম আলাউদ্দিন আল বিরযালী, ইমাম জামালুদ্দিন আল-মিযযী, ইমাম শামসুদ্দিন আয-যাহাবী, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ইমাম ইবনে কাছীর, ইমাম তাজুদ্দিন আস-সুবকি প্রমুখ উলামায়ে কেরামের জামাত। অপরদিকে মিশরে ছিলো ইমাম ইয্যুদ্দিন বিন আবদুস সালাম, ইমাম ইবনু দাকিকিল ঈদ, কাযীল কুযাত বদরুদ্দিন ইবনে জামাআহ, শাইখুল ইসলাম সিরাজুদ্দিন আল বুলকাইনী প্রমুখের জামাত। অনুরূপ হিজায ও ইয়ামেনসহ সালতানাতের অন্যান্য অঞ্চলও ইলমের বড় বড় মহীরুহদের পদচারণায় মুখরিত ছিলো। ইলমের এমন মুখর পরিবেশে আমীর-উমারা, সুলতানগণ ও তাদের সন্তানরাও পিছিয়ে ছিলেন না। তারাও ছিলেন এই পরিবেশের গর্বিত সদস্য। উল্লেখযোগ্য অবদানে তারাও ইলমের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। আসলে তাদেরকে যেভাবে গড়ে তোলা হয়, তাতে রাজনীতি ও সমরনীতির মতো ইলম অর্জনেরও অবারিত সুযোগ থাকে। এজন্য তাদের মধ্যেও নানা বিষয়ের অভিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম তৈরি হতো। জীবনী ভিত্তিক ইতিহাসের কিতাবগুলো মন্থন করা হলে এর অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে। কিছু নমুনা পেশ করা হলো।
প্রথমে মামলুক সালতানাতের দীর্ঘ এগারো বছরের আমীর আরগুন শাহের আলোচনা করা যায়। তিনি বিভিন্ন উলামায়ে কেরাম থেকে ইলম অর্জন করেছেন। তবে ইলমে ফিকহে ছিলো তার বিশেষ দখল। তিনি এক্ষেত্রে এমন ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন যে, আসাতিজায়ে কেরাম তাকে ফতোয়া প্রদানের অনুমতি দিয়েছিলেন। তিনি বুখারী শরীফের পাঠ গ্রহণের পর বাতির মিটমিটে আলোতে এক রাতেই পুরো বুখারী শরীফ অনুলিপি করে নেন। কিতাব সংগ্রহের প্রতিও ছিলো তার অদম্য স্পৃহা। একবার এক আমীর ইন্তেকাল করেন। তার ব্যক্তিগত মাকতাবায় ছিলো মূল্যবান কিতাবের বিপুল সমাহার। সন্তানরা পিতার মাকতাবা বিক্রির ঘোষণা দিলো। তখন আমীর আরগুন শাহ দুই লক্ষ্য স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে সে মাকতাবার কিতাবাদি কেনার জন্য লোক পাঠান।
তেমনই একজন আমীর ছিলেন বদরুদ্দিন হাসন বিন খাস রহ.। তার গভীর পাণ্ডিত্যে অভিভূত হয়ে তৎকালীন উলামায়ে কেরাম তাকে ফকীহ ও মুফতি অভিধায় ভূষিত করেছিলেন। তিনি একদিকে ছিলেন সুলতানের দেহরক্ষীদের বিশেষ বাহিনীর সদস্য, অন্যদিকে ছিলেন উলামায়ে উম্মতের গর্বিত সদস্য। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে তাগরী বারদী বলেন, হাসান বিন খাস ছিলেন বিখ্যাত ফকীহ। ছিলেন দক্ষ সৈনিক। ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ ও আরবী ভাষার উপর ছিলো তার অগাধ পাণ্ডিত্য। তার ইলমী সুখ্যাতির কারণে তাকে ফতোয়া প্রদান ও পাঠদানের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
মামলুকদের আরেক জ্ঞানপুরুষ ছিলেন কায়রো পাহাড়ের দুর্গপতি আমীর তাগরী বারমিশ মুয়াইয়াদী। তিনিও ছিলেন ইলমের অঙ্গনে উঁচু মাপের ব্যক্তিত্ব। তার ব্যাপারে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক তাগরী বারদী আল মানহালুস সাফিতে বলেন, তিনি একদিকে ছিলেন বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস, অপরদিকে ছিলেন রাজধানীর নিরাপত্তা পরিশোধের সুদক্ষ সৈনিক। তিনি সেসময়ের বড় বড় উলামায়ে কেরাম থেকে ইলম অর্জন করেছেন। ইবনে তাগরী বারদী বলেন, ইলমে হাদিসে তার বিশেষ পাণ্ডিত্য রয়েছে। তিনি ইমাম মুহিব্বুদ্দিন আল হাম্বলীর কাছে বুখারী শরীফ পড়েছেন। আবু দাউদ শরীফ পড়েছেন হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানীর কাছে।
আমীর আলামুদ্দিন সাঞ্জার আত তুর্কি আস সালেহী ছিলেন মামলুকি সালতানাতের আরেক জ্ঞানবৃক্ষ। ইমাম শামসুদ্দিন আয-যাহাবী রহ. তারিখুল ইসলাম নামক গ্রন্থে তার আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, তিনি তো ছিলেন মহান আমীর, মহিমান্বিত আলেম ও সম্মানিত মুহাদ্দিস। তিনি অনেক হাদিস অন্বেষণ করেছেন। এবং অনেক কিতাবের মূল কপি সংগ্রহ করেছেন। যাহাবী রহ.বলেন, শামের প্রখ্যাত দুই মুহাদ্দিস ইমাম জামালুদ্দিন আল মিযযী রহ. ও ইমাম বিরযালী রহ. তার থেকে ইলমে হাদিস অর্জন করেছেন।
এভাবে জীবনী ভিত্তিক ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে মামলুক সুলতান ও আমাত্যবর্গের এমন অনেকের জীবনী পাওয়া যাবে, যারা একদিকে ছিলেন জিহাদের ময়দানের শাহসওয়ার, অপরদিকে ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূর্যপুরুষ। এজন্য ইলম হাসিলের উদ্দেশ্যে তাদের কাছে দিগি¦দিক থেকে ছাত্ররা ছুটে আসতো। এবং তাদের ইলমের পিপাসা নিবারণ করতো।
মামলুক শাসকগণ কেবল পুরুষ শায়খদের থেকেই ইলম অর্জনে ক্ষ্যান্ত হননি। যাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে, তারা নারী মুহাদ্দিসদের থেকেও ইলমে হাদিস অর্জন করেছেন। এক্ষেত্রে ইমাম খলীল বিন তুরুনতাই আল আদেলীর নাম প্রণিধানযোগ্য। তিনি বিভিন্ন মাশায়েখ থেকে হাদিসের ইলম অর্জন করেছেন। এবং সে যুগে বুখারী শরীফের একজন বিখ্যাত বর্ণনাকারীতে পরিণত হয়েছেন। তথাপি তিনি বুখারী শরীফের প্রখ্যাত মহিলা বর্ণনাকারী ওজিরা বিনতে উমর আত-তানুখিয়্যাহ থেকে বুখারী শরীফের পাঠ গ্রহণ করে সনদ নিয়েছেন।
জীবনী ভিত্তিক ইতিহাসের কিতাবাদি অধ্যয়নে এমনও কিছু মামলুক আমীরের সন্ধান পাওয়া যাবে, যারা জীবনের শেষদিকে এসে সৈনিক পেশা ছেড়ে দেন। তাদের ক্ষেত্রে বলা হয়, তিনি সামরিক পোশাক পরিধান করতেন। পরবর্তীতে সেই পোশাক ছেড়ে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে নাম নেওয়া যায় প্রখ্যাত ইমাম খলীল বিন কাইকালদী রহ. এর। তার সমকালীন প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক সাফদি আয়ানুল আসর নামক গ্রন্থে তার আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, তিনি ছিলেন মহান ইমাম, নানা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট ফকীহ, প্রাজ্ঞ ব্যাকরণবিদ, সুসাহিত্যিক, খ্যাতনামা ঐতিহাসিক। নানা ইলমের সুসমন্বয়ে তিনি ছিলেন বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি শুরুর দিকে সমরিক পরিধান করতেন। পরবর্তীতে সেই পোশাক ছেড়ে দিয়েছেন।
অনুরূপভাবে ইমাম সাখাবী রহ. আদ দাওউল লামে লিআহলিল কারনিত তাসে নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, আমীর আহমাদ বিন কুনদুগদী রহ. ছিলেন বড় আলেম, বিজ্ঞ ফকীহ। তিনি প্রথম দিকে সামরিক পোশাক পরিধান করতেন। তার ইলমী যোগ্যতা এবং রাজনৈক দূরদর্শিতা এই পরিমাণ ছিলো যে, তিনি বিভিন্ন প্রতাপশালী বাদশাদের কাছে কূটনৈতিক সফরে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছার সফল বাস্তবায়ন করতে পারতেন। এজন্য তাকে ইতিহাস খ্যাত বাদশা তৈমুর লংয়ের কাছে রাষ্ট্রদূত হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিলো।
ইবনে তাগরী বারদী আন নুজুমুল বাহিরা গ্রন্থে বলেন, আমীর যাইনুদ্দিন উমর ইবনে সাইফুদ্দিন ছিলেন নানা বিয়য়ে পারদর্শী বিজ্ঞ আলেম। তিনি তার যুগে আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ শাস্ত্রের ইমাম পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অন্যান্য বিষয়েও তার বেশ জানাশোনা ছিলো। তিনি সামরিক পোশাক পরিধান করতেন। সাদামাটা চলাফেরা করতেন। তিনি রাজনীতি ও ইলমের মাঝে এতোটা সুসমন্বয় করেছিলেন যে, পরবর্তীদের মাঝে তার সমকক্ষ কাউকে দেখা যায় না।
এমনই আরেকজন সৈনিক ফকীহ ছিলেন ইউসুফ বিন শাহীন বিন কুতলুবুগা রহ.। তিনি তার নানা ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী আশ শাফেয়ীর কাছে ইলমের সুধাবাটি পান করেন। তবে মাজহাব হিসেবে হানাফি মাজহাবই অনুসরণ করে চলতেন। তার বাবা আমীর হওয়ার সুবাদে সমরবিদ্যার প্রতিও তার আকর্ষণ ছিলো। তিনি তিরন্দাজিতে অল্প সময়ে বেশ পারদর্শিতা অর্জনে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি সৈনিকদের পোশাক পরিধান করতেন। শেষদিকে সুলতানের অনুমতিক্রমে সামরিক পোশাক ছেড়ে দিয়েছিলেন।
ইমাম সাখাবী রহ. বলেন, আলী বিন উমর বিন সুলাইমান আল খুয়ারাজমী ছিলেন সৈনিক পরিবারের সন্তান। তিনি সামরিক বিভাগ থেকে নিয়মিত ভাতা পেতেন। এই ভাতা কেবল মামলুক পরিবারের লোকজনকেই দেওয়া হতো। তিনি যখন ইলম অর্জনে মনোনিবেশ করেন, ইবনে হাযম আয-যাহেরীর কিতাবদি পড়ে খুবই মুগ্ধ হন। ফলে সর্বক্ষেত্রে তিনি তার কথাই মান্য করতেন। এক পর্যায়ে তিনি যাহেরী মাজহাব গ্রহণ করেন। ইলমের প্রতি অধিক আসক্তির কারণে সামরিক বিভাগ থেকে ভাতা নেওয়া বন্ধ করেন। বাকী জীবন কেবল ইলমের ব্যস্ততাতেই কাটিয়ে দেন।
তবে নিজ পেশায় থেকেও অনেকে ইমাম পর্যাযের ব্যক্তিত্বে হয়েছেন। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায় আমীর আলাউদ্দিন আলী বিন বালবানের কথা। তিনি একদিকে সৈনিকের দায়িত্ব পালন করতেন, অপরদিকে তিনি ইলমের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী। তিনি বড় বড় উলামায়ে কেরাম থেকে আরবী ব্যকরণ শাস্ত্র, দর্শন শাস্ত্র, হাদিস, ফিকাহসহ নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন। এজন্য উপাধি হয়ে গিয়েছিলো “আলআমীর, আল মুফতি, আল মুহাদ্দিস, আল জুনদি আল হানাফি”। আমীর ইবনে বালবান সামরিক বিষয়েও এমন দক্ষতা অর্জন করেছিলেন যে, সহকর্মীদের মাঝে বড় ধরনের অবস্থান অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। সাফদির ভাষ্য মতে তিনি বেশ কিছু রচনাও প্রস্তুত করেছেন। তন্মধ্যে রয়েছে ইমাম সাদরুদ্দিন প্রণীত কিতাবুল জামে নামক গ্রন্থের একটি ভাষ্যগ্রন্থ। প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনে হিব্বানের সহীহ গ্রন্থকে ফিকহের অধ্যায় আকারে বিন্যস্ত করেছেন। অনুরূপভাবে তাবরানী প্রণীত আল মুজামুল কাবীর নামক গ্রন্থকেও ফিকহের অধ্যায় আকারে বিন্যস্ত করেছেন।
ইবনে বালবানের এই সুউচ্চ মর্যাদার স্বীকৃতি দিতে গিয়ে বলেন, তিনি ইলমের গভীরতা ও তাকওয়ার উচ্চতার কারণে কাজী হওয়ার যোগ্য ছিলেন।
মামলুকী সালতানাতের সবচে বড় সফলতা হলো এই, একজন সৈনিক সম্পূর্ণ নিরক্ষর অবস্থায় তাদের কাছে আসে। তাদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে এই নিরক্ষর লোকগুলোই একসময় অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও দূরদর্শী সমরবিদ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখার ইমাম পর্যায়ের ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়।
মামলুকগণ ইলমের প্রচার প্রসারেও বেশ আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে তারা উলুমুল কুরআন, হাদিস, ফিকাহ , উসুলে ফিকাহ ইত্যাদির প্রসারে বেশি আগ্রহী ছিলেন। বিভিন্ন শহরে ঘোষণা দিয়ে তরিা হাদিসের দরস দিতেন। এক্ষেত্রে কায়রোর বিখ্যাত দুর্গের ভূমিকা ছিলো অনেক বেশি। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মাকরীজি তার আস সুলুক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, একবার সুলতান শাবান বিন হাসান বিন মুহাম্মদ বিন কালাউন ঘোষণা দিলেন যে, তিনি কায়রো পাহাড়ের দুর্গে বুখারী শরীফের দরস প্রদান করবেন। অতপর নির্ধারিত তারিখে অনেক কাযী ও উলামায়ে কেরামের উপস্থিতিতে তিনি বুখারীর দরস প্রদান করেছেন। এভাবে বিভিন্ন বৈঠকে সুলতান পূর্ণ বুখারী শরীফের দরস দিয়ে শেষ করেন।
ঐতিহাসিক তাগরী বারদী বলেন, একবার এমন হয়েছে যে, সুলতান ধারাবাহিক দুই মাস পড়িয়ে বুখারী শেষ করেন।
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, তিনি শাইখুল ইসলাম সিরাজুদ্দিন আল বুলাকাইনি রহ. এর একটি নির্দিষ্ট সনদে বুখারী শরীফ বর্ণনা করতেন। তিনি সেটার অনুলিপি করে রেখেছেন। সব সময় এটা তিনি সাথে রাখতেন। আমরা তার কয়েকটি মজলিসে উপস্থিত হয়ে উপকৃত হয়েছি।
মামলুক সুলতান আমাত্যবর্গ ও তাদের সন্তাদের মধ্যে লেখালেখির বেশ ভালো চর্চা ছিলো। এজন্য জীবনীভিত্তিক ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে তাদের নানা কিতাবের কথা পাওয়া যায়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সালাউদ্দিন আস সাফদি বলেন, বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও সৈনিক শিহাবুুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল্লাহ আল হুসামী সৈনিক হওয়ার পাশাপাশি একজন বিদগ্ধ হাদিস বিশারদ ছিলেন। তিনি নিজ হাতে অনেক হাদিসের অনুলিপি করেছেন। তৈরি করেছেন হাদিসের নানা সংকলন । লিখেছেন ইতিহাসের বিস্তৃত গ্রন্থ। তিনি বিশিষ্ট মুহাদ্দিস কাযী যিয়াউদ্দিন ইবনুল খতীবের চল্লিশ হাদিসের কিতাবের উপরও একটি ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচনা করেছেন। প্রতিটি হাদিসে সূত্রের শুদ্ধাশুদ্ধি ও ব্যাখ্যা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন।
ইমাম আলাউদ্দিন মুগলতাই রহ.ও লেখালেখির অঙ্গনে অনেক অগ্রসর ছিলেন। তিনি শতাধিক কিতাব রচনা করেছেন। আল্লামা ইবনে হাজার আসকলানী রহ. আদ দুরারুল কামিনা গ্রন্থে বলেন, মুগলতাই রহ. কেবল লেখকই ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন একজন বস্তুনিষ্ঠ লেখক। যা লিখতেন, অত্যন্ত যাচাই বাছাই করে লিখতেন। তিনি উঁচু মাপের ভাষাবিদ ছিলেন। কিছু কিছু বিষয়ে বড় বড় ভাষাবিদদের সাথে তার মতপার্থক্য রয়েছে।
মামলুক সম্প্রদায়ের আরেক বড় দিকপাল হলেন ইমাম কাসিম ইবনে কুতলুবুগা রহ.। তিনি ছিলেন ফিকহে হানাফির একজন বিদগ্ধ আলিম এবং হাদিসের প্রসিদ্ধ ইমাম। আল্লামা সাখাবী রহ. বলেন, তিনি অনেক কিতাব রচনা করেছেন। বর্তমানে তার বেশ কয়েকটি কিতাব প্রকাশিত হয়েছে। যেমন তাজুত তারাজিম, আত তারাজিম ফি তাবাকাতিল ফুকাহা। গরীবুল কুরআন।
মামলুক সুলতানদের দরবারে বিভিন্ন ইলমী বিষয়ে বিতর্কের আয়োজন হতো। এর বিবরণও ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে এসেছে। যেমন একবার সুলতান মুয়াইয়াদের দরবারে একটি বিতর্ক অনুষ্ঠান হয়। সেখানে কাযী আলাউদ্দিন বিন মুগলা ও ইমাম নিযামুুদ্দিন রহ. ছিলেন। তখন কাযী আলাউদ্দিন বিন মুগলা রহ. বলেন, হে নিজামুদ্দিন, তোমার মাজহাবের (হানাফি মাজহাবের) কোন মাসয়ালা শোনাও। তখন তিনি একটা মাসয়ালা পেশ করেন। উভয়ে এর উপর বিতর্ক করেন। তখন সুলতানও তাদের সাথে আলোচনায় যোগ দেন।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে আরবশাহ আল হানাফি রহ. আত্তালিফুত তাহির ফি শিয়ামিল মালিকিয যাহের গ্রন্থে উল্লেখ করেন, সুলতান আবু সাঈদ জামজাকের দরবারে যখনই কোন ফিকহী মাসয়ালার আলোচনা হতো, তিনি এর উপর একটা এমন মন্তব্য করতেন, যাতে বুঝা যেতো, এই বিষয়ে তার গভীর জানাশোনা রয়েছে।
ইবনে আরবশাহ বলেন, আমি অনেকবারই তার মজলিসে উপস্থিত হয়েছি। প্রতিবারই এই বিষয়টি লক্ষ্য করেছি।
মামলুকরা সবচে বেশি অবদান রেখেছেন ইতিহাস শাস্ত্রে। বলা যায়, অষ্টম শতাব্দির শুরু থেকে নবম শতাব্দির প্রায় মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ইতিহাস শাস্ত্রে মামলুকদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো। তারা ইতিহাসের উপর অনেক কিতাব রচনা করেছেন। এরমধ্যে সর্বপ্রথম উল্লেখ করা যায় আমীর বাইবার্স আদ দাওয়াদারের নাম। তিনি সপ্তম শতাব্দির মাঝামাঝি সময় থেকে অষ্টম শতাব্দির শুরু পর্যন্ত নানা ঘটনা প্রবাহের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনি সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স, মানসুর কালাউন, নাসির মুহাম্মদ বিন কালাউনের যুগে রাজনৈতিক ও সামরিক নানা দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তার দেখা নানা বিষয়ের উপর লিখেছেন ইতিহাসের বিখ্যাত দুই কিতাব যুবদাতিল ফিকরাহ ফি তারিখিল হিজরাহ আর কিতাবুত তুহফাতিল মামলুকিয়্যাহ ফিদ দাওলাতিত তুরকিয়্যাাহ। উভয়টিই মামলুকদের ইতিহাস ও রাজনৈতিক-সামরিক নানা ঘটনা প্রবাহের উপর লিখিত। কিতাবের বিষয়গুলো যেহেতু প্রত্যক্ষ দর্শনের নিমিত্তে লিখিত, এজন্য ইতিহাস শাস্ত্রে এর মূল্য অনেক।
মামলুক ঘরানার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ছিলেন আমীর আবু বকর বিন আবদুল্লাহ বিন আইবেক আদ দাওয়াদারি। তিনি কানযুদ দুরার ওয়া জামিয়ুল গুরার নামে ইতিহাসের অনেক বড় একটি সংকলন তৈরি করেন। তাতে তিনি সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে তার যুগ পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস সংকলন করেন। অতপর সেটা তৎকালীন সুলতান নাসির মুহাম্মদ কালাউনের কাছে পেশ করেন।
মামলুকদের আরেক খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ ছিলেন সালাহ উদ্দিন খলীল বিন আইবেক আস সাফদী। তার বাবা শামের সাফদ অঞ্চলের আমীর ছিলেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই ইলমের প্রতি প্রবল আগ্রহী ছিলেন। তিনি পঞ্চাশের অধিক কিতাব রচনা করেছেন। এর মধ্যে তার সবচে মূল্যবান কাজ ছিলো তারীখে কাবীর। বর্তমানে তা আল ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত নামে ৩০ খণ্ডে ছেপে এসেছে। এই কিতাব থেকেই লেখক তার সমকালীন উলামায়ে কেরামের জীবনী আলাদাভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। তা বর্তমানে আওয়ানুন নাসর ফি আয়ানিল আসর নামে ছয় খণ্ডে ছেপে এসেছে।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবরাহিম বিন আইদামুর বিন দুকমাকও ছিলেন মামলুক সম্প্রদায়ের লোক। আল্লামা সাখাবী রহ. বলেন, তিনি ছিলেন নিজ সময়ের মিসরের সেরা ইতিহাসবিদ। তিনি সালতানাতের নানা দায়িত্বে সম্পৃক্ত ছিলেন। পূর্বের দুই ইতিহাসবিদের মতো তিনিও রচনা করেছেন ইতিহাস বিষয়ে নানা কিতাব। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নুযহাতুল আনাম ফি তারিখিল ইসলাম, আল জাওহারুস সামীন ফি সিয়ারিল খুলাফা ওয়াল মুলুকি ওয়াস সালাতিন। তিনি হানাফি ফুকাহার জীবনী ভিত্তিক তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ নামে একটি গ্রন্থও সংকলন করেন।
মামলুকদের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ছিলেন আবুল মাহাসিন জামালুদ্দিন ইউসুফ বিন তাগরী বারদী। তার বাবা সুলতান ফারাজ বিন বারকুকের সেনা অধিনায়ক ছিলেন। এই সুবাদে তিনি সুলতান ও বড় বড় আমীরদেরকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। এবং তাদের অনেক সিদ্ধান্ত বিস্তর জানতে সমর্থ হয়েছেন। তিনিও ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচনা করেছেন। তার পরবর্তী সকল ঐতিহাসিকই তার কিতাবাদি থেকে উপকৃত হয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে আন নুজুমুয যাহেরা ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহেরা। আল মানহালুস সাফি ওয়াল মুস্তাওফি বাদাল ওয়াফি।
মামলুকদের আরেক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ছিলেন খলীল বিন শাহিন আয যাহেরী। তিনিও বিভিন্ন সময় সালতানাতের নানা কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। ইলমে ফিকহের ক্ষেত্রে তার এতোটা পরিপক্কতা অর্জিত হয়েছিলো যে, আল্লামা সাখাবী বলেন, আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী তাকে ফতোয়া প্রদানের অনুমতি দিয়েছিলেন।তার ফিকাহ ছাড়াও অন্যান্য অনেক বিষয়ে তার পারদর্শিতা ছিলো। ইতিহাস-সাহিত্যও বেশ ভালো বুঝতেন। তিনিও অনেক কিতাবাদি রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে বুদ্দাতু কাশফিল মামালিক ওয়া বয়ানুত তুরুকি ওয়াল মাসালিক। আল মাওয়াহিব ফি ইখতিলাফিল মাযাহিব।
তার ছেলে কবি যাইনুদ্দিন আবদুল বাসেত বিন খলীলও অনেক ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেসব রচনাবলীতে তার সময়কালকে তিনি খুব তিক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তার সময়টা ছিলো মামলুকদের পতনের সময়কাল। তিনি তার রচনাবলীতে তুলে ধরেছেন এমন সমৃদ্ধ ও জৌলুসপূর্ণ সাম্রাজ্য কীভাবে পতনের দিকে গড়িয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে নাইলুল আমাল ফি যাইলিদ দুআল। এটাকে তিনি ইমাম যাহাবী রহ. প্রণীত তারিখুল ইসলামের পরিপূরক হিসেবে লিখেছেন। তিনি ১৩৪৩ হি. থেকে ১৪৯২ হি. সময়কালের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তার বৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ হলো আর রাওজুল বাসিম ফি হাওয়াদিসিল উমর ওয়াত তারাজিম।
মামলুকদের শেষের দিকের প্রধান ঐতিহাসিকদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মদ বিন আহমাদ বিন ইয়াস আল হানাফি। তিনি ছিলেন মামলুক সালতানাতের পতন যুগের সাক্ষী। তার দাদা ইয়াস আয যাহেরী ছিলেন সুলতান যাহের বারকুকের মামলুক। এই সুবাদে তিনি মামলুকদের পতনের কারণগুলো খুবই তিক্ষ্ণতার সাথে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি মন খুলে লিখেছেন কেন উসামানী বাহিনীর কাছে তাতারদের পরাজিত করা বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থের তালিকায় রয়েছে বাদায়িউজ জুহুর।
মামলুক সালতানাতের পতনের মধ্য দিয়ে মামলুকদের সোনালী যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে। মামলুক হিসেবে পরবর্তীরা হয়তো তাদের ইতিহাস জানার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করবে না। এজন্যই হয়তো মামলুকরা ইতিহাসের প্রতি এতটা ঝুঁকেছে। নিজেদের ইতিহাস নিজেরাই লিখে গেছে। যেন পরবর্তীরা এসে জানতে পারে, মামলুকদেরও একটি সমৃদ্ধ সালতানাত ছিলো। এবং তা ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম এক সমৃদ্ধ সালতানাত ছিলো।
The post মামলুকি সালতানাতে ইলম ও ইতিহাসের চর্চা appeared first on Fateh24.
source https://fateh24.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b2%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%ae-%e0%a6%93-%e0%a6%87/
No comments:
Post a Comment